Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩ ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতনকাঠামো

 আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, তিন অর্থবছরে তিন ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রস্তাবনায় নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।



সম্প্রতি সচিবালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-সংক্রান্ত বিশেষ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।


কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়বে বেতন? (উদাহরণসহ)

নতুন বেতনকাঠামোতে মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হলেও প্রথম দুই বছর সরকারি কর্মচারীরা এর একটি অংশ পাবেন এবং তৃতীয় বছরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা চালু হবে।

  • প্রথম বছর (আগামী ১ জুলাই থেকে): নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্তমান মূল বেতনের চেয়ে যতটুকু টাকা বৃদ্ধি পাবে, তার ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে।

    উদাহরণ: ধরা যাক, একজন কর্মকর্তার বর্তমান মূল বেতন ৫০,০০০ টাকা। নতুন কাঠামোতে তা বেড়ে হলো ১,০০,০০০ টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধি পেল ৫০,০০০ টাকা। প্রথম বছর তিনি বর্ধিত অংশের ৫০% অর্থাৎ ২৫,০০০ টাকা যোগ করে মোট ৭৫,০০০ টাকা মূল বেতন পাবেন। ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা আগের নিয়মেই থাকবে।

  • দ্বিতীয় বছর (পরবর্তী জুলাই থেকে): কর্মকর্তা তাঁর নতুন কাঠামোর পূর্ণ মূল বেতন অর্থাৎ ১,০০,০০০ টাকা পাবেন। তবে ভাতা আগের হিসাব অনুযায়ীই থাকবে।

  • তৃতীয় বছর (শেষ ধাপে): পূর্ণাঙ্গ মূল বেতনের পাশাপাশি নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য সকল ভাতা ও সুবিধা দেওয়া শুরু হবে।


বেতন কমিশনের সুপারিশ ও প্রেক্ষাপট

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ২৭ জুলাই জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি, মানুষের জীবনমান এবং পার্শ্ববর্তী দেশের বেতন কাঠামো বিবেচনা করে গত ২১ জানুয়ারি কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

  • ১০০% থেকে ১৪০% বৃদ্ধির সুপারিশ: নতুন কাঠামোতে বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

  • গ্রেড বা ধাপ: আগের মতোই ২০টি গ্রেড থাকছে।

  • সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন: সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। (সিনিয়র সচিবদের জন্য বিশেষ ধাপ আলাদাভাবে ঘোষণা করা হবে)।

  • অতিরিক্ত ব্যয়: বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তবে প্রথম বছর শুধু মূল বেতনের অংশ দিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।


অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতার পরিবর্তন

মূল বেতন বৃদ্ধির ফলে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য ভাতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন হলো:

  • বৈশাখী ভাতা: মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ।

  • যাতায়াত ভাতা: আগে এটি ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেতেন, এখন তা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

  • বাড়িভাড়া: উচ্চ পদের কর্মকর্তাদের (১ম থেকে ১০ম গ্রেড) তুলনায় নিম্ন পদের কর্মচারীদের (১১তম থেকে ২০তম গ্রেড) বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।


পেনশনভোগীদের সুবিধাও বাড়ছে দ্বিগুণ

কর্মরত চাকুরিজীবীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও শতভাগের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে:

  • মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার কম হলে: প্রায় ১০০% বৃদ্ধি।

  • মাসিক পেনশন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হলে: ৭৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি।

  • মাসিক পেনশন ৪০ হাজার টাকার বেশি হলে: ৫৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি।

বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা:

  • ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য: মাসিক ১০,০০০ টাকা।

  • ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য: মাসিক ৮,০০০ টাকা।

  • ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য: মাসিক ৫,০০০ টাকা।


বিশেষজ্ঞদের মত

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি এবং জিডিপির তুলনায় দুর্বল অর্থনীতির কারণে বাজেটে অনেক কাটছাঁট করতে হচ্ছে, তবে এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীদের দিকটি বিবেচনা করে ১ জুলাই থেকেই এটি কার্যকর করা হচ্ছে।

বেতন বৃদ্ধির এই যৌক্তিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে গবেষণা সংস্থা সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তটি বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সঠিক। তবে একই সাথে আমলাতন্ত্রের উৎকর্ষতা, সরকারি কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।

Post a Comment

0 Comments

Surah Waqiah Read Online

Followers